একজন কৃষিবিদের করোনা জীবনের অভিজ্ঞতা !

আগস্টের ৬ তারিখ গা ব্যথা শুরু। ৭ তারিখ আরও বেশি। ৮তারিখ জ্বর ও ব্যথা, কাশি তীব্র এবং গন্ধ, স্বাদহীন জীবন। করোনার নানা উপসর্গ বিদ্যমান। আমার সহকর্মী ও নিকট আত্নীয় ইলিয়াছুর রহমান কে ফোন দিলাম। বললেন, ” পজিটিভ মনে হচ্ছে । আইসোলেশন ও ওষুধ শুরু করো। টেস্ট কি করবা?” জ্বি — নিশ্চিত হওয়া দরকার।

৯ তারিখ কোভিড -১৯ পরীক্ষার নমুনা দিতে যাই আমি ও আমার সহধর্মিণী।

লক্ষণ শুরু তো আইসোলোশন শুরু। ১১ তারিখ এশার নামাজ আদায় করছি। ৯.৪৫ এ অপরিচিত মেবাইল নং থেকে ফোন এলো বরগুনা সদর থানা থেকে একজন এস আই পরিচয় নিশ্চিত হলেন। পজিটিব খবর দিলেন। তিনি সবরকম সহযোগিতা দিতে আশ্বস্ত করতে থাকলেন। বললাম, “আপনি চিন্তা করবেন না – আমি হোম অাইসোলোশন এ পরামর্শে আছি”। খুশি হলেন। বললেন, ঠিকাছে অামার সহধর্মিণীর কথা জিজ্ঞাস করলাম বললেন তার কভিড ১৯ নেগেটিভ । ফোন কাটলেন।

পরক্ষণেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ফোন। “ঘটনা তো জেনেছেন! আপনি চিকিৎসা কোথায় নেবেন আমি বললাম বাসায় বললো ঠিকাছে কালকে ব্যাবস্থাপত্র নেবেন । যেকোনো সময় ফোন দিবেন। ভয়ের কিছু নেই। আপনি ভালো আছেন”।

এরইমধ্যে আমার খুব কাছের ছোট ভাই ডাঃ মোস্তাফিজ ভাইর কাছে ফোন দিলাম সে হেসে হেসে আমার কথা শুনছে আর আমাকে অভয় দিচ্ছে  সাহস যোগাচ্ছেন, কৃতজ্ঞতায় কিছু মানুষ ভালোবাসা সচরাচর মুখে প্রকাশ করে না, অন্তরে ধারণ করে — ডাঃ মোস্তাফিজ ভাই এমনই।

ফোন হাতে নিলাম । বিষয়টি কাছের মানুষদের জানানো দরকার। কৃষিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান, উপজেলা কৃষি অফিসার স্যারকে অবহিত করলাম। স্যার অভয় ও মনে সাহস যোগালেন। নিজ ও পরিবারের প্রতি যত্নবান হতে বললেন। অতঃপর খোঁজখবর নিতে থাকলেন। কর্মস্থলে আকাশের মতো এমন নির্ভরতার ছাদ – সত্যিসত্যিই হ্যাপি করে। সাহস পাই। কৃতজ্ঞতায় বাঁধি অগণিতবার।

পজিটিভ নিউজটি মাকে জানানো ঠিক হবে না। মা’র শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। শুনেই কিনা ভেঙে পড়েন! তারপরেও মা কে জানালাম যেহেতু আমার বাবা নেই । মোবাইলে সেকি কান্না!মা বললো অাল্লাহ হেফাজত করবেন কোনো চিন্তা করবি না।

পরদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডাঃ মাহমুদ সাহেব খবর নিলেন। বললেন, ” ভাই করোনা বিষয়টি মাথায় রাখবেন না। ভুলে যান। আপনার কি ডায়বেটিস প্রেসার আছে আমি বললাম হ্যা নিয়ন্ত্রনে আছে বললেন ঠিকাছে, সারাদিন বদ্ধ রুমে থাকবেন না। ছাদে যাবেন, বসবেন, ব্যায়াম করবেন। রিলাক্স থাকবেন। সমস্যা হলে জানাবেন।ঔষধগুলো ঠিকভাবে খাবেন।বিনাকারণে ভালোবাসা পাই। কৃতজ্ঞ তাদের প্রতি।

উপজেলা কৃষি অফিসার স্যার ও ড. সগীরুল ইসলাম মজুমদার স্যার প্রতিদিন ফোন দেন এবং বরিশাল সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মোঃ তৌহিদ স্যার ও ড. মোঃ নজরুল ইসলাম শিকদার স্যার (DSCO) বরগুনা, আমার ও পরিবারের খোঁজ নিতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন এবং সবরকম সহোযোগিতার আশ্বাস দিতেন।

১৫ তারিখ হবে। ঢাকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একজন ডক্টর ফোন দিয়েছেন। শরীরের খবর, কী কী ওষুধ চলে, পরিবারের খবর, কত টাকা খরচ হয়েছে, ইনকাম সোর্স নানা তথ্য জেনেছেন। ওষুধ কেনা ও পরিবার পরিচালনায় কোন অর্থনৈতিক সহযোগিতা লাগবে কি না — তাও জেনেছেন। এমনকি গত দু দিন আগেও ফোন দিয়ে শারীরিক সুস্থতার আপডেট জেনেছেন। একজন সাধারণ নাগরিকের অসুস্থতায় রাষ্ট্রের এমন দায়িত্বশীল আচরণ দেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ না জানালে অকৃতজ্ঞতা হয়।

কোভিড পজিটিভের কথা তেমন করে কাউকে জানানো হয়নি। তারপরেও কিছু প্রিয়জন এবং আমার অনেক সহকর্মী বিশেষ করে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে সুস্থতার জন্য দোয়া প্রার্থনা করেছেন। মেসেজ, ফোন কিংবা দূর থেকে দোয়া করে মানসিকভাবে আমাকে সুস্থ থাকতে সহায়তা করেছেন। তাদের সকলের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা।

অবশ্য এমন নিকটাত্মীয়ও এবং আমার কিছু সহকর্মী আছেন যারা অসুস্থতার সব সংবাদ জেনেও একটিবার ফোন দেননি কিংবা খবরও নেননি। তাদের প্রতি বিশ্বাস ভাঙলেও ভালোবাসা অটুট আছে এবং দোয়া করি আল্লাহ যেন তাদের সুস্থ্য রাখে!

তিনজন মানুষের কথা না বললেই নয় প্রথমত আমার শশুর যিনি প্রতিদিনই আমাকে ফোন করতেন এমন কি বাসায় আসতে চেয়েছেন আমাকে দেখার জন্য আমি আসতে নিষেধ করেছি কারন তিনি অসুস্থ । তারপরেও

আঃ রহিম, মাকসুদ বাসায় ছুটে এসেছে ওদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

৯ বছরের সাওদা বাবাকে এতো ভালোবাসে — সেটি নতুন করেই বুঝতে পেরেছি।

বিশেষ ধন্যবাদ আমার বাল্যবন্ধুদের যারা আমার অসুস্থতার জন্য তাদের প্রোগ্রাম বাতিল করছেন এবং সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করেছেন ও অামার জন্য দোয়া করেছেন।

এবং আমি যাদের নিয়ে কাজ করি সমাজের পিছিয়ে পরা মানুষ আমার প্রিয় কৃষক ভাইরা যারা আমার কাছে ফোনালাপের মাধ্যমে খবর নিয়েছেন এবং দোয়া করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

পরিশেষে আমার সহধর্মিণীর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা কেননা তার সেবায় আমি সুস্থ্য হয়েছি মহান অাল্লাহ তাকে নেক আয়ু দান করুন।

সবটুকু শুকরিয়া আল্লাহ সুবহানা তাআ’লার প্রতি – যিনি দয়াকরে করোনা পজিটিভ থেকে সুস্থতা দান করেছেন এবং কভিড ১৯ রিপোর্ট নেগেটিভ করেছেন

আলহামদুলিল্লাহ।

(ভুল ত্রুটি মার্জনীয়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *