Home / খেলাধুলা / ক্রিকেট অঙ্গনে আগমন এবং কার কাছে মিরাজ নিয়েছিলেন ক্রিকেটের হাতেখড়ি?

ক্রিকেট অঙ্গনে আগমন এবং কার কাছে মিরাজ নিয়েছিলেন ক্রিকেটের হাতেখড়ি?

Allbdnews24.com

স্পোর্টস আপডেট ডেস্ক- ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে গ্রাম ছেড়ে একদিন শহরে এসেছিলেন জালাল হোসেন। ড্রাইভারি শিখে ধরেছিলেন মাইক্রোবাসের স্টিয়ারিং। স্বপ্ন ছিল ছেলেমেয়ে দুটিকে লেখাপড়া শেখাবেন। তাদের মানুষ করতে পারলে দুঃখ ঘুচবে। কিন্তু সেই ছেলে কি না রাত-দিন পড়ে থাকে ক্রিকেট নিয়ে! বাবা বকাঝকা করেন, এমনকি মাঝেমধ্যে পিঠে দু-চার ঘাও বসিয়েছেন। কিন্তু নানাজন তাঁকে বুঝিয়েছে, ছেলেটি ক্রিকেট ভালো বোঝে, খেলেও ভালো। শুনতে শুনতে একসময় মন গলে বাবার, ছেলেকে ছাড় দেন। ফল পেতেও দেরি হয়নি। আজ সেই ছেলেই তাঁকে তুলে দিয়েছে দেশের সবচেয়ে গর্বিত বাবাদের কাতারে। এখন সবার কাছে তাঁর পরিচিতি ‘মেহেদীর বাবা’।

miraj
মিরাজ, মিরাজের বাবা, বোন

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট সিরিজ শেষ হবার পর যাকে নিয়ে এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনা চলছে, তিনি হলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। মাত্র ১৯ বছর বয়স তাঁর, কিন্তু এই বয়সেই জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক সিরিজে দুটি টেস্ট খেলে ১৯টি উইকেট শিকার করে ফেলেছেন তিনি। চট্টগ্রামে টেস্টে জীবনের প্রথম ইনিংসে ছয়টি উইকেট সহ ৭টি উইকেট। আর এরপর মিরপুরে দ্বিতীয় টেস্টে মিরাজ নিয়েছেন ১২টি উইকেট।

বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলে মেহেদী হাসানকে নতুন তারকা হিসেবে বর্ণনা হলেও ক্রিকেটে তাঁর অলরাউন্ডার কীর্তি আগেই দেখেছে বিশ্ব। অনুর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দানকারী মেহেদী হাসান মিরাজই সেই টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছিলেন।

ক্রিকেট অঙ্গনে মিরাজের আগমনটা কিভাবে হয়েছিল? কার কাছে তিনি নিয়েছিলেন ক্রিকেটের হাতেখড়ি?

পরিবারের কাছ থেকে জানা গেল মেহেদী হাসান মিরাজ ক্রিকেট খেলা শুরু করেন একেবারে নিজের আগ্রহ থেকেই। বরিশালে মিরাজের জন্ম হলেও তাঁর পুরো পরিবার গত ১৬ বছর ধরে খুলনায় বাস করছে। বাবা, মা আর ছোট বোন নিয়ে মিরাজের পরিবারের সদস্য চারজন। বাবা মো: জালাল হোসেন একজন অটোরিক্সা ড্রাইভার। তিনি মাঝে অসুস্থ ছিলেন। ১০ মাস আগে কিডনিতে অপারেশন হয়েছে। এখন আর গাড়ি চালান না। মা মিনারা বেগম গৃহিণী।

আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন মিরাজ। ক্রিকেট খেলায় ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ ছিল তাঁর। তবে পরিবার থেকে ক্রিকেট খেলায় কোনও সমর্থন পেতেন না বলে লুকিয়ে ক্রিকেট খেলতেন তিনি। এমনকি ক্রিকেট খেলার জন্য বাবার হাতে মারধোরও খেতে হয়েছে মিরাজকে।

তাঁর বাবা জালাল হোসেনও একথা স্বীকার করে বললেন যে আর সব বাবার মতো তিনিও চাইতেন ছেলে ভালোমতো লেখাপড়া শিখে ভালো চাকরি করুক। “প্রথম থেকেই আমি তার ক্রিকেট খেলাকে সমর্থন করতাম না। আমি গরীব মানুষ, আর সবার মতো আমিও চাইতাম ছেলে ভালো পড়ালেখা করে সরকারি চাকরি করুক। ক্রিকেট খেলে যে সে এতদূর আসবে এটাতো আমার কল্পনাতেও ছিল না” – বলেন মিরাজের বাবা জালাল হোসেন।

মিরাজের বাবা আরও বলেন, ‘ছেলের এই সাফল্যে শুধু খুলনা নয়, সারা দেশের মানুষ আনন্দিত। মিরাজের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আমি টিভিতে ছেলের খেলা দেখেছি। খুব ভালো লেগেছে।’ তিনি ছেলের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। তাঁর আশা, মেহেদী আরো ভালো করুক। দেশ ও দেশবাসীর মুখ উজ্জ্বল করুক।

জানা যায়, বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় জন্ম মিরাজের। উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের আউলিয়াপুর গ্রামের বৈরমখার দীঘি পূর্ব পাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে জন্ম হয়েছিল তাঁর। আর্থিক অনটনের কারণে প্রায় ১৫ বছর আগে খুলনায় পাড়ি জমায় তাঁর পরিবার।

দীঘির পাড়ের সেই ঝুপড়ি ঘরেই গতকাল রাতে কথা হয় মিরাজের দাদি জবেদা বিবির সঙ্গে। তিনিও নাতির খেলা দেখেন, তবে অন্যের ঘরে। পাশের প্যাদাবাড়িতে গিয়ে টিভিতে নাতির খেলা দেখেছেন। গতকাল সকালে দুজনের কথাও হয়েছে মোবাইল ফোনে।

জবেদা বিবি বলেন, ‘মোগে বাড়িতে কারেন্ট (বিদ্যুৎ) নাই। হ্যার পরও নাতির খ্যালা দেখছি প্যাদা বাড়িতে যাইয়া। শুক্রবারই নাতি টিভি পাঠাইছে, ঘরে কারেন্ট নাই।’

স্থানীয় বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে মেহেদী এলাকায় আসে। প্রায় বছরখানেক ধরেই আমরা তাঁর সম্পর্কে মিডিয়া থেকে জেনেছি। সে এলেই বাড়িতে লোকজন জড়ো হয়। আমাদের এলাকার ছেলে জাতীয় দলে খেলছে, এর চেয়ে বেশি সম্মানের আর কী হতে পারে।’

মিরাজের বাবা জালাল হোসেন আরও জানান, খুলনার কাশিপুর ক্রিকেট একাডেমির কোচ মো: আল মাহমুদের হাত ধরেই মেহেদী হাসান মিরাজ এতদূর এগিয়েছে।

কথা হয়েছিল মো: আল মাহমুদের সাথেও। মি: মাহমুদ জানান, মিরাজকে তিনি আট বছর বয়স থেকে দেখছেন এবং সেই বয়স থেকেই ক্রিকেট খেলার প্রতি তীব্র আগ্রহ ছিল ছেলেটির মধ্যে।

কিন্তু একাডেমিতে যে টাকা দিয়ে ভর্তি হয়ে ক্রিকেট খেলবে সেই অবস্থা মিরাজের ছিল না। একে তো টানাটানির সংসার, অন্যদিকে লুকিয়ে সে ক্রিকেট খেলতো। তবে প্রতিবেশী রাসেল হোসেনের সহায়তায় কোচ আল মাহমুদকে পাশে পান মিরাজ।

image-45059-1477923442আল মাহমুদ বলছিলেন, মিরাজের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না হলেও ওর তীব্র ইচ্ছা আর সাহসী মানসিকতা দেখে তাকে তিনি প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেন। “সবচেয়ে মজার বিষয় হলো মিরাজের বাবা মাঠে এসেও তাকে মারধোর করেছে, মাঠ থেকে নিয়ে যেতো। আমি একদিন বললাম আপনি যদি ওকে এখানে খেলতে না দেন তাহলে এই এলাকায় আপনি থাকতে পারবেন না” – মিরাজের বাবাকে হুমকি দেয়ার বিষয়টি হাসতে হাসতে জানাচ্ছিলেন মি: মাহমুদ।

ওই একাডেমি থেকে বয়সভিত্তিক বাছাইয়ে প্রথমেই অনুর্ধ্ব-১৪ দলে সুযোগ পান মেহেদী হাসান মিরাজ। অনুর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ২৫ হাজার টাকা জেতেন মিরাজ, এরপর অবশ্য তাঁর বাবা আর খেলায় বেশি বাধা দেননি।

অনুর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টের পর অনুর্ধ্ব-১৫ টুর্নামেন্টেও ডাক পান মিরাজ। তারপর আস্তে আস্তে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে থাকেন তিনি। অনুর্ধ্ব-১৯ দলে জায়গা করে নিয়ে দলের নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগও চলে আসে তাঁর সামনে এক সময়।

আর অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে থেকেই মেহেদী হাসান মিরাজের নামটি জানতে পারেন অনেকে। এরপর তাঁর পারফরম্যান্স দিয়েই তিনি জাতীয় দলে জায়গা করে নেন। এরপর জাতীয় দলে অভিষেকে তাঁর পারফরম্যান্স দেখেছে বিশ্ববাসী।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

n5

অবশেষে সেই আশরাফুলকে নিয়ে দল ঘোষণা করা হয়েছেন, ফের কাঁপাবেন মাঠ

সময় নেই হাতে। আয়োজক বিসিবি। আর মাত্র ৪ দিন পর শুরু হবে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট ...